রাজশাহীর ২৩৮ শিক্ষার্থীর বৃত্তি পরীক্ষার ফল ‘গায়েব’
রাজশাহী শহরের ২৩৮ জন শিক্ষার্থীর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল ‘গায়েব’ হয়ে গেছে। তারা ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। সবাই রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। তারা এখন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। তাদের একজনও প্রাথমিকে বৃত্তি না পাওয়ায় অভিভাবকেরা ধারণা করছেন, তাদের খাতা হয়ত হারিয়ে গেছে। এ নিয়ে অভিভাবকেরা শিক্ষা অফিসে ভিড় করছেন।
যে ১১টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফল পাওয়া যায়নি সেগুলো হলো- রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেরোখাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্নদা সুন্দরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছোটবনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটকোষি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিরোইল কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কৃষ্ণকান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজশাহী বোর্ড মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা। এসব বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীরও বৃত্তির ফলাফল আসেনি।
রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমান জানান, এই বিদ্যালয়ে তার নিজেরসহ মোট ১১টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। গত ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ এপ্রিল বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিশ্বপরিচয় ও বিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হয়। বিশ্বপরিচয় ও বিজ্ঞান বিষয়ে ৫০ করে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হয়। বাংলা, গণিত ও ইংরেজির পরীক্ষা হয় ১০০ নম্বর করে। বোয়ালিয়া থানার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা রোজি খন্দকার পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নপত্র আনতেন। পরীক্ষা শেষে তিনিই খাতা নিয়ে যেতেন। গত রোববার (১২ জুলাই) সারাদেশের বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। কিন্তু এই কেন্দ্রে যারা পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের একজনও বৃত্তি পায়নি। তখন তারা বুঝতে পারেন যে, এই ২৩৮ শিক্ষার্থীর ফলাফলই হয়নি। কেন হয়নি তা তিনি জানেন না।
রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারহানা খাতুন বলেন, ‘আমরাই পরীক্ষা নিলাম, অথচ আমাদের বাচ্চাদেরই ফলাফল আসেনি। এবার আমাদের অনেক ভাল ব্যাচ ছিল। এ রকম ব্যাচ বিগত ১০ বছরেও ছিল না। কিন্তু একজনও বৃত্তি পাবে না এটা অবিশ্বাস্য। ফলাফল নিয়ে যে কোনো একটা সমস্যা অবশ্যই হয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের ফলাফল না আসায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরাও। বৃত্তির ফল প্রকাশের পর থেকে তারাও নিজ নিজ সন্তানের স্কুল এবং থানা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ভিড় জমাচ্ছেন।
বোর্ড মডেল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সৈয়দ আবদুল মুনিম কাজল বলেন, ‘আমরা এত কষ্ট করে বাচ্চাদের পড়াশোনা করালাম, কিন্তু সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে রেজাল্ট আসেনি। এখন বাচ্চার কান্না কোনোমতেই থামছে না। এক কেন্দ্রের ২৩৮ জন শিক্ষার্থীর কেউ বৃত্তি পাবে না, এটা তো হতেই পারে না। হয়ত খাতা হারিয়ে গেছে। আমরা তদন্তের দাবি জানাই। কোথায় ত্রুটি তা খুঁজে বের করে যেন ফলাফল প্রকাশ করা হয়।’
রাজশাহীর আটকোষি সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীলুফা আখতার খানম বলেন, ‘২০২০ সালের পর এবার আবার প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমাদের ১৭ জন শিক্ষার্থী ছিল। আমরা কয়েকজনের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলাম যে তারা বৃত্তি পাবে। কিন্তু কারও ফলাফল আসেনি। এ বিষয়টি তদন্তের জন্য আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন দিচ্ছি। তিনি নিশ্চয়ই বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন।’
জানতে চাইলে বোয়ালিয়া থানা শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। কেন্দ্র থেকে খাতা আনার পর আমরা জেলা প্রশাসকের ট্রেজারিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। ট্রেজারি থেকে খাতা অন্য কোনো জেলার পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি খাতা মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে খাতা ও ফলাফল জমা দিয়েছেন। তারপর সেটি ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে গেছে। সেখান থেকেই ফলাফল হয়েছে। এখন এক কেন্দ্রের কারও ফলাফল না আসায় অভিভাবকেরা আমার কাছে আসছেন। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আবেদন করছেন। আমরা বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তিনি পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন।’
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার জেলা কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমাদেরও খুব মন খারাপ। দলে দলে অভিভাবকেরা আমার কাছে আসছেন। আমি অভিভাবকদের কোনো জবাব দিতে পারছি না। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য লিখিত আবেদন দিচ্ছেন। আমরা সেটা অধিদপ্তরে পাঠিয়ে দেব।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এতগুলো খাতা হয়ত হারিয়ে যায়নি। ফলাফল প্রস্তুতের সময় কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এটা হতে পারে। অধিদপ্তর এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’