রামেবি উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগ: বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার
রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হককে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আব্দুস সালাম (৫৬) নামে এক বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার গভীর রাতে নগরীর প্যারামেডিক্যাল এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার আব্দুস সালাম রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি বলে জানা গেছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজীউর রহমান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, রামেবি উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন মঙ্গলবার রাতে রাজপাড়া থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর ওই মামলার ভিত্তিতে আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবারের ঘটনার সময় রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরীফুজ্জামান শামীমের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রবেশ করে। ওই দলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আল মোস্তাক শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল এবং জিয়া মঞ্চের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বুলবুল ও লাল্টু ছিলেন বলেও কর্মকর্তারা দাবি করেন।
এদিকে উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগ করানোর অভিযোগের প্রতিবাদে এবং কথিত ‘মব কালচার’-এর বিরুদ্ধে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন করেন চিকিৎসকরা।
‘রাজশাহীর সর্বস্তরের চিকিৎসক সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, জোর করে উপাচার্যকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসকদের রোগীদের চিকিৎসা ও অপারেশনে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে তাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।
ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. তাসমিয়া আক্তার বলেন, কোনো শিক্ষক বা চিকিৎসককে যেন ভবিষ্যতে এভাবে অপমানিত হতে না হয়, সে জন্য ঘটনার সুষ্ঠু বিচার প্রয়োজন।
ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহসান বলেন, একজন চিকিৎসক ও শিক্ষককে এভাবে অপদস্থ করার ঘটনায় চিকিৎসক সমাজের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান।
কী ঘটেছিল
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ২০ থেকে ৫০ জনের একটি দল রামেবি উপাচার্যের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই সময় অধ্যাপক জাওয়াদুল হক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণকাজ নিয়ে ভার্চুয়াল সভায় ছিলেন।
রামেবির উপ-রেজিস্ট্রার মো. মোফাকখারুল ইসলাম জানান, দলটি উপাচার্যকে কোনো কিছু না পড়েই একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ দেয়। এ সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে নাজমুলকে আরেকটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দলটি উপাচার্য ও তার ব্যক্তিগত সহকারীর স্বাক্ষর করা দুটি পদত্যাগপত্র নিয়ে যায়। একই সঙ্গে উপাচার্যের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও নিয়ে নেওয়া হয়।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা কার্যালয়ের সিসিটিভি সরঞ্জাম খুলে নেওয়া, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।
অধ্যাপক জাওয়াদুল হক অভিযোগ করেন, কার্যালয়ে প্রবেশকারীদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। অন্যরা বহিরাগত এবং তাদের পেছনে রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থন ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, তাকে স্থানীয় ঠিকাদারদের পরিবর্তে ঢাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজের চুক্তি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। একপর্যায়ে তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়।
উপাচার্যের অভিযোগ, একপর্যায়ে তাকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পরে কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানান এবং অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
