হারানো চিঠির আবেগ ফেরাতে রাবিতে দিনব্যাপী চিঠি উৎসব
রাবি প্রতিনিধি: একটা সময় প্রিয়জনের সঙ্গে দূরবর্তী যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল চিঠি। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিঠি লেখার প্রচলন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে চিঠি লেখার ঐতিহ্য ও আবেগ তুলে ধরতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী চিঠি উৎসব ও ডাকটিকিট প্রদর্শনী।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনের সামনে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। উৎসবে কলম হাতে কেউ লিখেছেন মাকে, কেউ প্রিয়জনকে, আবার কেউ চিঠিতে প্রকাশ করেছেন মনের গোপন অনুভূতি। শিক্ষার্থীদের লেখা চিঠি বিনামূল্যে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে ডাক বিভাগ।
চিঠি উৎসবে এসে সময়ের চাকা পেছনে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিমা ইসলাম। মাকে চিঠি লিখতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, যেন ফিরে গেছেন নব্বইয়ের দশকে।
ফাহিমা ইসলাম বলেন, “এ আয়োজনটি আমার কাছে খুবই ভালো লাগছে। কারণ, আমরা কখনো এভাবে চিঠি লিখিনি। বর্তমানে আমরা আধুনিক যুগে বাস করছি, যেখানে চিঠি লেখার প্রচলন প্রায় হারিয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ বাবা-মাকে, কেউবা প্রিয়জনকে চিঠি লিখছেন। সব মিলিয়ে এটি একটি সুন্দর মুহূর্ত। আমি মনে করি, এই সংস্কৃতি ফিরে আসা উচিত। অন্তত এ ধরনের দিবস উপলক্ষে হলেও চিঠি লেখার প্রচলন ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুস সবুর বলেন, “আজকের চিঠি উৎসবে চিঠি লিখতে পেরে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারছি, যা কখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ ধরনের চিঠি উৎসব মাঝে মাঝে আয়োজন করা দরকার। চিঠি লেখার সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য। এটি ধরে রাখা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা অনেক সময় মুখে মনের কথা বলতে পারি না। প্রিয়জন বা মনের মানুষের কাছে লিখে অনুভূতি প্রকাশের আলাদা আনন্দ রয়েছে। তাই চিঠি লেখার সংস্কৃতি আমাদের ধরে রাখা উচিত।”
রাজশাহীর পোস্টমাস্টার জেনারেল আল মাহমুদ বলেন, একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগ। সময়ের পরিবর্তনে চিঠির জায়গা দখল করেছে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। চিঠি পাওয়া, খুলে পড়া, জমিয়ে রাখা এবং মাঝেমধ্যে আবার পড়ার যে আনন্দ, তা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, মানুষ আবার সেই আনন্দ ও আবেগের জায়গায় ফিরে আসুক। চিঠি লেখার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতেই আমাদের এ আয়োজন। আজ শিক্ষার্থীরা আসছেন, ঘুরছেন ও চিঠি লিখছেন। ডাক বিভাগ চিঠিগুলো সংগ্রহ করে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেবে। যারা চিঠি লিখতে চান, তারা বিনামূল্যে প্রিয়জন বা পছন্দের মানুষের কাছে চিঠি পাঠাতে পারবেন।”
আল মাহমুদ আরও বলেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন মুঠোফোনেই মানুষ সহজে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছেন। এতে চিঠি লেখার প্রয়োজনীয়তা কমলেও এর আবেগময় দিকটি নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা রয়ে গেছে। সেই আনন্দের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
চিঠি উৎসবের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে ডাকটিকিট প্রদর্শনী। এতে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের ইতিহাস, ডাক বিভাগের চিঠি আদান-প্রদানের ইতিহাস এবং সংগৃহীত চিঠির ঐতিহাসিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনী ঘুরে শিক্ষার্থীরা ডাকটিকিট ও চিঠির ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগে চিঠি লেখার হারানো ঐতিহ্য ও আবেগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
