অন্ধ অনুকরণের বাহবা, অবমূল্যায়িত প্রকৃত প্রকৌশল
নূর মোহাম্মদ সাদ: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, শিল্প অটোমেশন ও আইওটি-ভিত্তিক নানা সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করছেন। তবে এসব প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও উদ্ভাবন অনেক সময় গণমাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায় না।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়াই শৌখিন বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্র বা যানবাহনকে চটকদারভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা যায়। কোনো ব্যক্তি সীমিত উপকরণ ব্যবহার করে হেলিকপ্টার, গাড়ি কিংবা অন্য কোনো যন্ত্র তৈরি করলেই সেটিকে প্রকৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হলে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
প্রকৌশল শুধু কিছু বানিয়ে ফেলার নাম নয়, প্রকৌশলবিদ্যার সঙ্গে নকশা, গাণিতিক হিসাব, উপকরণের বৈশিষ্ট্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরাপত্তার মতো বিষয় সরাসরি যুক্ত। একটি যানবাহন তৈরি করা এবং সেটিকে নিরাপদ, টেকসই ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য করে তোলা এক বিষয় নয়।
বিশেষ করে উচ্চগতির যান বা যন্ত্রের ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল স্ট্রেস, টর্ক, ব্রেকিং ব্যবস্থা, কাঠামোগত স্থায়িত্ব এবং সম্ভাব্য ত্রুটির ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি। এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করে তৈরি কোনো উদ্ভাবন জনসমক্ষে আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তব ব্যবহারে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু চটকদার শিরোনাম বা ব্যতিক্রমী কোনো উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন তৈরি করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
একই সঙ্গে কোনো শৌখিন উদ্ভাবনকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বিকল্প হিসেবে দেখানোও সমীচীন নয়। বরং একজন উদ্ভাবকের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তার উদ্ভাবনের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা প্রয়োজন।
দেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা করলেও গবেষণার ফলাফল বাস্তবায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। অর্থায়ন, গবেষণাগার সুবিধা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় এবং নীতিগত সহায়তার ঘাটতি উদ্ভাবনকে সীমিত করতে পারে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তিকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বাস্তব প্রয়োগ ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা।
শৌখিন উদ্ভাবন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা উভয় ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনের মূল্যায়ন হওয়া উচিত এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, টেকসইতা ও বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনার ভিত্তিতে। গণমাধ্যমে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও একইভাবে তথ্য যাচাই ও বিশেষজ্ঞ মতামতের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃত গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি নতুন উদ্ভাবকদেরও যথাযথ সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞানমনস্ক গণমাধ্যম এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তার সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে।
